Home / সম্পাদকীয় বিভাগ / প্রসঙ্গ পাসপোর্ট ও পুলিশ

প্রসঙ্গ পাসপোর্ট ও পুলিশ

এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যের ঘুষ-দুর্নীতি সম্পর্কিত অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে বারবার প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না বললেই চলে। এর ফলে একদিকে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে ঘুষের খাত বা ক্ষেত্র। এখন আর এমন কোনো ক্ষেত্রের কথা বলা যাবে না, যেখানে পুলিশকে ঘুষ না দিয়ে এবং শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। শুনতে ও ভাবতে খারাপ এমনকি লজ্জা লাগলেও বর্তমান বাংলাদেশে এটাই কঠিন সত্য।

এ বিষয়ে সর্বশেষ কিছু তথ্য জানা গেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ Ñটিআইবি’র এক গবেষণা রিপোর্টে। গত ২১ আগস্ট রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানিয়েছে, পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ মানুষকেই ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে। আবেদনপত্র উত্তোলন, জমাদান ও প্রি-এনরোলমেন্ট, বায়ো-এনরোলমেন্ট, পাসপোর্ট বিতরণ এবং দালালের সঙ্গে চুক্তির শর্ত পূরণের মতো বিভিন্ন কারণে প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য মানুষকে গড়ে দু’ হাজার ২২১ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ঘুষের খাত সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে ওই রিপোর্টে। যেমন ভেরিফিকেশনের সময় ৭৫ দশমিক তিন শতাংশ আবেদনকারীর কাছ থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা এসবি জনপ্রতি ৭৯৭ টাকা করে ঘুষ আদায় করে। আবেদনপত্রে ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করার জন্য এসবির লোকজন এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যখন যে কোনো উপায়ে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য মানুষ ঘুষ না দিয়ে পারে না। পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় অনেককে জঙ্গি কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ভয়-ভীতি দেখানো হয়। অনেককে আবার এমন সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভয় দেখানো হয়, যেসব দলের প্রতি সরকারের মনোভাব অত্যন্ত কঠোর। এভাবে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যে, ৪৫ দশমিক তিন শতাংশ আবেদনকারী কেবলই ঘুষের বিনিময়ে পাসপোর্ট বের করে নিতে বাধ্য হয়। এছাড়া পাসপোর্ট গ্রহীতাদের ২৭ শতাংশ অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের কারণে এবং ২ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছে।
‘পাসপোর্ট সেবায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টটিতে টিআইবি আরো অনেক তথ্যই প্রকাশ করেছে, যেগুলোর মধ্য দিয়ে পুলিশের ঘুষের বাণিজ্য সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানা যায়। এই বাণিজ্যে পুলিশের সঙ্গে রয়েছে পাসপোর্ট অফিসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারি এবং পাসপোর্টের কাজে বহু বছর ধরে তৎপর প্রতিষ্ঠিত দালালেরা। এদের সকলের সমন্বয়ে পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে একটি ভয়ংকর চক্র তৈরি হয়েছে। এই চক্রের কারণে একদিকে আবেদনকারীরা ঘুষ না দিয়ে পারছে না, অন্যদিকে স্বল্প সংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া কারো পক্ষেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাসপোর্ট অফিস থেকে স্লিপ দেয়ার সময় সুনির্দিষ্ট তারিখের কথা লিখিতভাবে জানানো হলেও দালাল চক্রের অপতৎপরতার শিকার মানুষদের ঘুরতে হয় দিনের পর দিন। একইভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তারাও, যাদের আগে থেকে পাসপোর্ট রয়েছে কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে যারা নবায়ন বা রিনিউ করতে যাচ্ছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিস্তারিত অনুসন্ধানশেষে পাসপোর্ট দেয়া হয়েছিল বলেই নবায়নের সময় নতুন করে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রশ্ন উঠতে পারে না। কিন্তু সেটাও করা হচ্ছে আজকাল।
এভাবে সম্ভাব্য সকল পন্থাতেই পাসপোর্ট পেতে আগ্রহীদের হেনস্থা করা হচ্ছে বলে টিআইবি তার গবেষণা রিপোর্টে জানিয়েছে। ঘুষ বাণিজ্যের অবসান ঘটানোসহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ১২ দফা সুপারিশও পেশ করেছে সংস্থাটি। টিআইবি বলেছে, পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের কোনো দরকার নেই। পরিবর্তে সরকার সকল নাগরিকের ‘বায়োমেট্রিক ডাটা ব্যাংক’ এবং অপরাধীদের জন্য পৃথক একটি ডাটা ব্যাংক তৈরি করতে পারে। যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি প্রকল্প সম্পন্ন করা হয়েছে সেহেতু যে কোনো নাগরিক সম্পর্কেই তথ্য জানা এখন কঠিন কোনো কাজ নয়। পাশাপাশি যদি সন্ত্রাসী-অপরাধীদের জন্য পৃথক একটি ডাটা ব্যাংক তৈরি করা যায় তাহলে পাসপোর্ট ইস্যু করার আগে আবেদনকারীদের সম্পর্কে সহজেই তথ্য জেনে নেয়া সম্ভব। একই কারণে আলাদাভাবে পুলিশ ভেরিফিকেশনের দরকার থাকতে পারে না। এই ব্যবস্থা করা গেলে ঘুষ-দুর্নীতির অবসান ঘটবে স্বল্প সময়ের মধ্যে। দ্বিতীয় এক সুপারিশে টিআইবি পসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর করার কথা বলেছে। এর ফলেও বিশেষ করে নবায়নের সময় মানুষকে ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হতে হবে না বলে মনে করে সংস্থাটি। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথাও রয়েছে টিআইবির ১২ দফা সুপারিশে। দালালদের ব্যাপারেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে টিআইবি।
আমরা মনে করি, কোনো একটি বিষয়েই সামান্য বাড়িয়ে বলা হয়নি টিআইবির গবেষণা রিপোর্টে। সরকারের উচিত টিআইবির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। একথা বুঝতে হবে যে, বর্তমান সময়ে চাকরিসহ বিভিন্ন কাজে বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিককে বিদেশে যাতায়াত ও বসবাস করতে হয়। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স বহুদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান একটি খাতের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সুতরাং পাসপোর্ট পাওয়ার ব্যাপারে নাগরিকদের হয়রানি করার অপতৎপরতার অবসান ঘটানো দরকার কাল বিলম্ব না করে।

সূত্র:daily sangram

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *