Home / রাজনীতি / আ’লীগ-বিএনপির দৌড়ঝাঁপে জামায়াতের সমীকরণ

আ’লীগ-বিএনপির দৌড়ঝাঁপে জামায়াতের সমীকরণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ডজন খানেক প্রার্থী রয়েছেন মনোনয়ন দৌড় প্রতিযোগিতায়। তারা মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মীদের বিয়ে-সাদি, দলীয় বর্ধিত সভা, পথসভা-সমাবেশ, ধর্মীয়-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অসুস্থ নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান আর নেতা-নেত্রীদের ছবিসংবলিত পোস্টার, ব্যানার ফেস্টুন সাঁটিয়ে এবং ভূরিভোজ আয়োজন করে জমজমাট নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। অন্য দিকে নির্বাচনী প্রচারণায় বসে নেই জামায়াত। তারা হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশ নিতে সব রকম প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছেন। তবে মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে সব দলই যেন প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, দায়িত্বশীলতা, সততা, ত্যাগ, শিক্ষিত ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে চূড়ান্ত প্রার্থিতা ঘোষণা করেন এমন প্রত্যাশা সাধারণ ভোটারদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনটি তাঁত শিল্পসমৃদ্ধ বেলকুচি ও যমুনাবিধ্বস্ত চৌহালী উপজেলার মোট ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। বেলকুচির মোট ভোটার দুই লাখ ৭৬ হাজার ৮৭২ ও চৌহালীর মোট ভোটার এক লাখ দুই হাজার ৪৫৬। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন তারাই দেশ পরিচালনা করেছেন। তাই এ আসনটির দিকে সব দলেরই বিশেষ একটি নজর থাকে। গুরুত্বপূর্ণ এ আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য, মণ্ডল গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডল। তিনি একজন সজ্জন ও সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও রাজনীতির মাঠে তিনি নতুন। দলীয় বিভিন্ন কৌশলে তিনি খুব বেশি সফল না হতে পারায় অনেক নেতাকর্মীই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছেন। এ দিকে একাদশ নির্বাচনে তার ছেলে মণ্ডল গ্রুপের পরিচালক আব্দুল মমিন মণ্ডল নমিনেশন চাইবেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাকে নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জনসভা ও উন্নয়নমূলক কাজের অনুষ্ঠানে এ রকম ইঙ্গিত দিয়েছেন বর্তমান এমপি ও তার সমর্থকেরা।

অপর দিকে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে হয়েছিলেন ক্যাবিনেট মন্ত্রী। করেছেন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ। তবে তার নিকটতমদের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা নির্বাচিত করায় অনেকের কাছেই আবার বিরাগভাজন হয়েছেন সাবেক এ মন্ত্রী। তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও বর্তমান এমপি ও অপর মনোনয়নপ্রাত্যাশীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন গোপনে। এ দিকে বর্তমান এমপি আব্দুল মজিদ মণ্ডল ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের মধ্যে বিরোধ এখন অনেকটাই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। করছেন একে অন্যের কঠোর সমালোচনা। তারা নিজ নিজ সমর্থক নিয়ে পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালনসহ চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচারণা।
তবে সাবেক ছাত্রনেতা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত মীর মোশারফ হোসেন মনোনয়ন দৌড়ে সরব রয়েছেন। তিনি ঢাকার বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বেলকুচির বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ ছাড়া প্রয়াত ও অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় নেতাকর্মীদের আর্থিক ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে খোঁজ খবর রাখছেন। এলাকায় নির্বাচনী সভা-সমাবেশে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করে সমর্থক, কর্মী ও ভোটার বৃদ্ধিতে গণসংযোগ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে তার সুসম্পর্ক থাকায় হাইকমান্ডের সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন জোর লবিং। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী তিনি।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মুসফিকুর রহমান মোহন ও বিশিষ্ট শিল্পপতি আতাউর রহমান রতন।
এ দিকে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাবেক এমপি মেজর (অব:) মুঞ্জুর কাদের নীরবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন। তিনি এ আসন থেকে ২০০৮ সালে মাত্র চার দিন আগে মনোনয়নপত্র নিয়ে এসে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের কাছে ২৫২ ভোটে হেরে যান। এরপর থেকে দলীয় কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন এলাকায় নেতাকর্মীর সাথে তার কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই, রাখেন না কোনো খোঁজখবর। তবে অনেকের কাছে তিনি শক্তিশালী প্রার্থী।
এ ছাড়া ওরিয়েন্টাল গ্রুপের পরিচালক রকিবুল করিম খান পাপ্পু বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি অল্প দিনের ব্যবধানে তার কর্মীবান্ধব নেতৃত্বের কারণে জেলা বিএনপির সদস্য থেকে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ে এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। জেলজুলুমে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীসহ এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুল আর্থিক সহযোগিতা করে ইতোমধ্যে বেলকুচি, চৌহালী ও এনায়েতপুর থানা বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠনের বেশির ভাগ নেতাকর্মীকে তার পাশে পেয়েছেন। এ ছাড়া নেতাকর্মীদের নিয়ে গণভোজ ও গণসংযোগ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। তিনি জেলা বিএনপি ও স্থানীয় বিএনপির দুঃসময়ে পাশে থাকায় কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সাথে রয়েছে নিয়মিত যোগাযোগ। এসব কারণে নেত্রী তাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
ধানের শীষ প্রত্যাশী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম এলাকায় চালিয়ে যাচ্ছেন ঘরোয়া বৈঠক ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে প্রচারণা। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির নতুন কমিটির সহপ্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। জেলজুলুমে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে না দাঁড়ানোর অভিযোগ এনে নির্বাচনী এলাকায় তার সমর্থিত ছাত্রদল ও যুবদলের একটি বৃহৎ অংশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সখ্য থাকায় কেন্দ্রেীয় নেতাদের সাথে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অপর দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে বসে নেই জামায়াত। তারা কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের নিদের্শনায় দলের প্রার্থী হিসেবে বেলকুচি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ আলী আলমকে নিয়ে অনেকটা কৌশলে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে বেলকুচি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম সোহেল সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়া বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আনাসর আলী সিদ্দিকীর ছেলে, চৌহালী উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর (অব:) আব্দুল্লাহ আল মামুন, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুময়ুন ইসলাম খান ও বেলকুচি ডিগ্রি কলেজসহ একাধিক বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম কোরাইশ খানের ছেলে ও সাবেক এমপি শহিদুল্লাহ খানের ভাতিজা গোলাম মওলা খান বাবলু নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং মনোনয়ন পেতে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এবং মেজর (অব:) মুঞ্জুর কাদের ২০০৮ সালে এমপি প্রার্থী মনোনীত হলে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধে ম্ঞ্জুুর কাদেরকে ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-কামারখন্দ) আসন থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল লতিফ বিশ্বাস ৫১ হাজার ৬৮১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শহীদুল্লাহ খান ৪৮ হাজার ৩৬০ ভোট, জামায়াতের আলী আলম ২৩ হাজার ৮১৫ ভোট এবং জাতীয় পার্টির ওমর ফারুক প্রভাত ১৬ হাজার ৩৯১ ভোট পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি মোজাম্মেল হক এক লাখ ১৮ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আবদুল লতিফ বিশ্বাস ৫৪ হাজার ৬৩০ ভোট পান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুর রহমান ১৪ হাজার ১৮১ ভোট পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে আবদুল লতিফ বিশ্বাস এক লাখ ১৯ হাজার ৫৮২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চারদলীয় জোটের মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদের এক লাখ ১৯ হাজার ৩৩০ ভোট পান। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান রতনকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মজিদ মণ্ডল বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়।
উৎসঃ নয়াদিগন্ত

No automatic alt text available.

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *