(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({ google_ad_client: "ca-pub-2968137545784960", enable_page_level_ads: true });
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / শ্রীনগরের লালা বংশ লেখক- লালা রাজেন্দ্র কুমার বসু

শ্রীনগরের লালা বংশ লেখক- লালা রাজেন্দ্র কুমার বসু

tttttt

১৯জুলাই, শ্রীনগর নিউজঃ বিগত প্রায় তিন শত বর্ষের কায়েস’ সমাজের প্রকৃত ইতিহাসের অভাব লক্ষিত হইতেছে। বঙ্গের সামজিক বিকৃতিই ইহার মূল কারণ বলিয়া মনে হয়। বাঙ্গালায় মুসলমান শাসনকালে অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর প্রায় শেষ ভাগে বিক্রমপুর যে কায়েস’জাতি দ্বারা শাসিত হইত ইহা অস্বীকার করিবার বিশেষ কোন কারণ নাই। ‘বঙ্গীয় সমাজ’ প্রণেতা সতীশচন্দ্র রায় চৌধুরী এ বিষয়ে যথার্থ কথাই লিখিয়াছেন। বঙ্গদেশে উপর্য্যুপরি ধর্ম্ম পরিবর্ত্তন ও সামাজিক বিপ্লব সাধিত হওয়ায় কায়েস’গণের প্রাচীন সাহিত্যে ও ইতিহাসে অপলাপ ঘটিয়াছে। বঙ্গীয় কায়েস’গণ আচারভ্রষ্ট হওয়ায় একন সংস্কার বর্জ্জিত হইয়াছেন। কতদিন হইতে তাহারা প্রতম সাবিত্রীভ্রষ্ট হইয়াছেন তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। সম্ভবত: মুসলমান নবাবদিগের নিকট প্রতিপত্তিলাভ করিতে গিয়া বঙ্গীয় কায়েস’গণ সাবিত্রীভ্রষ্ট হইয়াছেন।
যাহাদের আদেশে সমাজের বিশুদ্ধি রক্ষা হইবে তাহাদের পতনে দেশের অকল্যাণই ঘটিয়া থাকে। কিন’ সেন রাজগণের শাসনকাল হইতে উলপুর, নতুল্লাবাদ, বামরাইন, গাভা, কাশীপুর, বানড়িপাড়া প্রভৃতি স’ানের কায়েস’গণ কায়েস’ সমাজের শীর্ষস’ান অধিকার করিয়া আসিতেছেন। কোন এক শুবক্ষণে উলপুরের বসুবংশের এক প্রবীণ ব্যক্তি সপরিবারে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে বিক্রমপুর আসিয়াছিলেন,- তিনিই কংসনারায়ণ বসু।
সে সময় বিক্রমপুর অনন্ত রত্নের ভাণ্ডার ছিল, বাণী কমলার অকৃপায় আজ সেই বিক্রমপুর ধনহীন; যে দেশ একদিন শস্যশ্যামলা সুজলা সুফলা ছিল, গ্রহের ফেরে আজ সেই বিক্রমপুরে দুর্ভিক্ষর তাড়নায় বাণী-কমলার বরপুত্রগণ প্রবাসী। পূর্ব্বকালে অনেক বিদেশী ভদ্রসন্তান বিক্রমপুরে একটুকু স’ান লইবার আশায় বিক্রমপুরের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতেন। পরে ইহারা বিক্রমপুর সমাজকে অশেষ উন্নতির সোপানে আরোহন করিতে বিশেষ সাহায্য করিয়া গিয়াছেন।
আমরা এখন পূর্ব্বোক্ত বিখ্যাত কংসনারায়ণের বংশের ইতিহাস প্রদান করিব
কংশনারায়ণ বসু নামক এক কায়েস’ কুলীন ভদ্রলোক ১১০৭ বঙ্গাব্দে উলপুরে (ফরিদপুর) জন্মগ্রহণ করেন। বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া তিনি উলপুর ত্যাগ করিয়া ইদীলপুরে আসিয়া বসবাস করিতে তাকেন। তৎপর ঘটনাক্রমে তিনি বিক্রমপুর পরগণার বেজগাঁও গ্রামে আসিয়া উপসি’ত হন এবং এ স’ানে আসার পর বেজগাঁয়ে “কুলংনাস্তি” বলিয়া ঘটকগণ কুলজি করিয়া দুই আনি বিদায় কমাইয়া দিলে কৌলিন্য রক্ষার্থে রায়েসবর গ্রামে মৌস্তফি মহাশয়দিগের বংশে উক্ত কংসনারায়ণ বিবাহ করিয়া সেইখানেই স’ায়ীভাবে বসবাস করিতে থাকেন, বেজগাঁও গ্রামে আর যান না। বিবাহ করিয়া রায়েসবর গ্রামে বাস করা কালীন, ক্রমে ক্রমে তাঁহার তিন পুুুত্র জন্মগ্রহণ করে। তাঁহার বৈষয়িক অবস’া অতি সাধারণ রকমের ছিল। প্রথম পুত্রের নাম কীর্ত্তিনারায়ন, তিনি ১১৪২ বঙ্গাব্ধে জন্মগ্রহণ করেন। ২য় পুত্রের নাম রামভদ্র, তৃতীয় পুত্রের নাম শিবনারায়ন ছিল। কীর্ত্তিনারায়নের মাতা অতি তেজস্বিনী ও বুদ্ধিমতী স্ত্রীলোক ছিলেন। কংসনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁহার স্ত্রী তিন পুত্রসহ রায়েসবর গ্রামেই বসবাস করিয়াছিলেন। সেকালের বিদ্যাশিক্ষা যতটা সম্ভব তাহাই তিন পুত্র পাইয়াছিল, প্রথম পুত্র কীর্ত্তিনারায়ণ অতি মেধাবী ও বুদ্ধিমান থাকায় লেখাপড়ায় একজন পণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছিলেন। অপর দুই ভ্রাতাও বিদ্যাশিক্ষা যথাসম্ভব করিয়াছিলেন। ঐ ছোট দু্‌ই ভ্রাতা চাকুরী করিয়া যৎসামান্য অর্থ উপার্জ্জন করিতেন, কিন’ কীর্ত্তিনারায়ণ কোন কার্য্য করিতেন না, ঘুরিয়া ঘুরয়া বেড়াইতেন, সেজন্য তিনি তাঁহার মাতার বিষদৃষ্টিতে পড়িয়াছিলেন। মাতা তাঁহাকে অধিক সময়ই তিরস্কার করিতেন তবুও তাঁহার ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবার বিসদৃশ অভ্যাস এবং সংসারের প্রতি অমনোযিোগ দূর হইল না। একদা কীর্ত্তিনারায়ণ প্রাত: সময় বাড়ী চড়িয়া পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়া বেকাল বেলা অতি ক্ষুধার্ত্ত হইয়া বাড়ী আসিয়া মাতাকে বলিয়াছিলেন, “মা আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছ, আমাকে খাইতে দিন”। মা উত্তর করিলেন, “তোমাকে আর কি দিব, তোমাকে ভাতের পরিবর্ত্তে ছাই দিব,” এই বলিয়া মাতা চলিয়া গেলেন, কীর্ত্তিনারায়ণ বসিয়া মনে মনে ভাবিলেন, “মা কি আর আমাকে “ছাই” খাইতে দিবেন? মা বোধ হয় ভাত নিয়া আসিতেছেন”। কিন’ কীর্ত্তিনারায়ণের মা প্রকৃত পক্ষেই এক থালায় ছাই নিয়া কীর্ত্তিনারায়নের নিকট দিয়া নানাপ্রকার ভৎর্সনা করিতে আরম্ভ করিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ তাহা দেখিয়া মনে বিষম আঘাত পাইলেন। এ সময়ে কীর্ত্তিনারায়ণে বয়স ২০/২১ বৎসর ছিল। তিনি চক্ষের জলে ভাসিয়া গেলেন এবং তখনই উঠিয়া একখানামাত্র চাদর সঙ্গে নিয়া, কেহকে কিছু না বলিয়া, কোথায় চলিয়া গেলেন। সে সময় পদ্মা নদী একটা খালের ন্যায় পরিসরবিশিষ্ট ছিল। তিনি ঐ নদী সাঁতার দিয়া পার হইয়া দক্ষিণপাড় যাইয়া উঠিলেন এবং ক্রমে ক্রমে হাঁটিতে হাঁটিতে সন্ধ্যাবেলা রাজনগর গ্রামে উপসি’ত হইয়া, মহারাজা রাজবল্লভের অতিথিশালায় উপসি’ত হইলেন। আহারাদি করিয়া ঐ রাত্রে তথায় রহিলেন। পরদিন মহারাজের সেরেস্তায় কোন উচ্চ কর্ম্মচারীর নিকট একটী কাজের প্রার্থী হইলে সেই কর্ম্মচারী কীর্ত্তিনারায়ণের চেহারা দেখিয়া দয়ার্দ্র হইলেন এবং সেরেস্তায় তাঁহাকে একটা কাজে ভর্ত্তি করিয়া দিলেন, এবং আহারাদির বন্দোবস্তও অতিথিশালায় করিয়া দিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ ক্রমেই তাঁহার কার্য্য-নৈপুণ্য দ্বারা উপরিস’ কর্ম্মচারীদিগকে সন’ষ্ট করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে এইরূপ হইয়া দাঁড়াইল যে, অনেক পুরাতন কর্ম্মচারীর উপরে তাঁহার কার্য্য হইল। ক্রমে ক্রমে তিনি উর্দ্ধতন কর্ম্মচারীর সহিত মহারাজের দরবারেও যাইতে আরম্ভ করিলেন এবং পরে মহারাজার কৃপাদৃষ্টিতে পড়িলেন।
কিছুকাল এইভাবে কীর্ত্তিনারায়ণের অতিবাহিত হইল। ওদিকে “মা” পুত্রের জন্য ব্যকুলা হইয়া অর্থ ব্যয় করিয়া পুত্রের অনুসন্ধানে নানাস’ানে লোক পাঠাইতেছিলেন। একটী লোক কীর্ত্তিনারায়ণের মাকে সংবাদ দিল, আপনার পুত্র অতি সুখে রাজনগর রাজার বাড়ীতে চাকুরী করিতেছেন। মা একথা শুনিয়া পুত্রকে দেখিবার জন্য অধীরা হইয়া পড়িলেন এবং পুত্রকে আনিবার জন্য পত্র দিয়া লোক প্রেরণ করিলেন। মাতার পত্র নিয়া লোক কীর্ত্তিনারায়ণের নিকট পৌঁছিলে পর কীর্ত্তিনারায়ণ মাতার পত্র পাঠ করিয়া, মাতার পূর্ব্ব ব্যবহার মনে করিয়া অশ্রুপাত করিলেন, এবং উর্দ্ধতন কর্ম্মচারীর নিকট বিদায় গ্রহণের জন্য প্রার্থনা করিলেন। উক্ত প্রার্থনা মহারাজের গোচরে আনা হইলে তিনি দয়ার্দ্র হইয়া বহু অর্থ দিয়া তাঁহাকে ১ মাসের ছুটী দিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ বাড়ী পৌঁছিলে মা ছুটিয়া আসিয়া তাঁহাকে কোলে নিয়া আনন্দ অশ্রু বিসর্জ্জন করিতে লাগিলেন। পুত্র মহারাজার প্রদত্ত অর্থ মাতৃচরণে সমর্পণ করিয়া মাতাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন। মাতাও পুত্রকে সস্নেহে বুকে তুলিয়া লইলেন। পুত্রের নিকট সমস্ত বিবরণ জ্ঞাত হইয়া মাতা অতীব আনন্দিত হইলেন এবং পুত্রের বিবাহের জন্য উদ্যোগী হইয়া ২৪ পরগণায় টাকিতে সম্বন্ধের খোঁজে লোক পাঠাইলেন। তথা হইতে “গুহ সরকার” কুলীন বংশীয় এক কন্যাকে আনিয়া পুত্রের বিবাহ দিলেন, কন্যার নাম ছিল ভুবনেশ্বরী। বধু অতি সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং দয়াবতী ছিলেন। বিবাহাদি হইয়া যাওয়ার পর কীর্ত্তিনারায়ণ মাতার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া পুনরায় মহারাজার সমীপে উপসি’ত হইলেন। মহারাজও কীর্ত্তিনারায়ণকে দেখিয়া সন’ষ্ট হইলেন এবং পূর্ব্ব কাজে তাঁহাকে থাকিতে আদেশ দিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণও মনোযোগী হইয়া নিজের কাজকর্ম্ম সারিয়া অন্যান্য সেরেস্তা সংক্রান্ত নানা কাজকর্ম্ম কিরূপে চলিতেছে সমস্ত তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতে ও শিক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। এইভাবে কিছু কাল গত হইলে, মুর্শিদাবাদের নবাব মীরকাসিম মহারাজা রাজবল্লভকে নিকাশ দেওয়ার জন্য তলব করিলেন। মহারাজা এবার স্বয়ং নবাব সমীপে যাইয়া নিকাশাদি দিবেন এইরূপ আদেশ হইয়াছিল। তদনুসারে মহারাজা যে যে কর্ম্মচারীকে সঙ্গে নিবেন তাহাদিগকে কাগজাদি সহ প্রস’ত হইতে আদেশ দিলেন। এদিকে জ্যোতির্ব্বিদ আনাইয়া তিনি যাত্রার দিন অবধারণ করিলেন। এই সমস্ত বিষয় কীর্ত্তিনারায়ণ জানিতে পারিয়া মহারাজার সহিত নবাবের নিকট যাইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন, কিন’ মনের ইচ্ছা মহারাজের নিকট স্বয়ং বলিতে সাহসী হইলেন না। মহারাজাকে অতি উদ্বিগ্ন দেখিয়া নিজে মনের ইচ্ছা বলিতে ভীত হইলেন, অথচ মনের ব্যাকুলতা এত বাড়িতে লাগিল যে, কিছুতেই সি’র থাকিতে পারিলেন না। এদিকে যাত্রার দিনও নিকটবর্ত্তী হইয়া পড়িতেছে এবং সকল উদ্যোগ শেষ হইয়াছে দেখিয়া আর তিনি সি’র থাকিতে পারিলেন না, প্রকজন উচ্চ পদের কর্ম্মচারীর নিকট মনের একান্ত ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া ফেলিলেন। উক্ত কম্মচারী কীর্ত্তিনারায়ণের প্রবল ইচ্ছা দেখিয়া মহারাজ সমীপে তাহা প্রকাশ করিলেন। মহারাজা প্রথম অত্যন্ত অনিচছা প্রকাশ করিলেন, কিন’ পরদিন কি মনে করিয়া কীর্ত্তিনারায়ণকে সঙ্গে নিতে আদেশ দিলেন। দেখা যায়, যখন যাহার ভাগ্যলক্ষ্মী প্রসন্না হন তখন একটা সুযোগ আসিয়া কর্ম্মপথে দাঁড়ায়, কীর্ত্তিনারায়ণেরও তাহাই হইয়াছিল। পরবর্ত্তী ঘটনায় তাহা প্রকাশ পাইবে।
মহারাজার যাত্রার দিন উপসি’ত হইল; শুভলগ্নে শুভক্ষণে মহারাজা যাত্রা করিয়া নৌকায় উঠিলেন। সেকালে রেলপথ বা জাহাজ ইত্যাদি কিছুই ছিল না, কর্ম্মচারীদের সঙ্গে কীর্ত্তিনারায়ণও যাত্রা করিয়া নৌকায় উঠিলেন। নৌকা ক্রমে পদ্মা, যমুনা, গঙ্গা পার হইয়া যথাসময়ে মুর্শিদাবাদ পৌঁছিল। নবাবের নিকট দূত যাইয়া মহারাজার আগমন সংবাদ জানাইলে নবাব বাহাদুর মহারাজকে তাঁহার সমীপে উপসি’ত হইবার জন্য আদেশ দিলেন। মহারাজা স্বর্ণ থালায় বহু মোহর নিয়া নবাব বাহাদুরের নিকট উপসি’ত হইলেন এবং যথোচিত অভিবাদন জ্ঞাপন করিয়া তিনি স্বর্ণ থালাসহ মোহর নজর দিয়া দণ্ডায়মান অবস’ায়ই নবাব বাহাদুরের কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। নবাবও প্রত্যভিবাদন করিয়া মহারাজকে বসিতে আসন দিলেন। মহারাজা ও নবাব বাহাদুরের মধ্যে ২/৪ মিনিট কথা হইবার পর নবাব তাঁহার দেওয়ানকে মহারাজার থাকিবার বাসস’ান ও আহারাদির সমস্ত ব্যবস’া করিয়া দিতে আদেশ দিলেন। দরবার ঐ দিনের জন্য ভঙ্গ হইল। মহারাজা তাঁহার কর্ম্মচারিগণসহ নির্দিষ্ট স’ানে অবস’ান করিতে লাগিলেন। ২/১ দিন অতিবাহিত হইলে পর, একদিন মহারাজার নিকট দূত আসিয়া নবাব সাহেব বাহাদুরের আদেশ জানাইল যে, আগামী শুক্রবার মধ্যাহ্নের পর যে দরবার বসিবে ঐ দরবারে মহারাজার নিকাশ দাখিল করিতে হইবে। কর্ম্মচারীগণ সমস্ত কাগজাদি সিজিল মিছিল করিতে লাগিল, কিন’কীর্ত্তিনারায়ণকে এই সব কাজে নিযুক্ত থাকিবার জন্য মহারাজার কোন আদেশ ছিল না, কীর্ত্তিনারায়ণও প্রকাশ্যে কোন কাজে যাইতেন না। কিন’কীর্ত্তিনারায়ণ পরোক্ষে সমস্ত কাগজাদির খোঁজ খবর এবং ভুলভ্রান্তি জানিয়া রাখিতে আরম্ভ করিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ এবং আরও ২/১টী কর্ম্মচারী ভিন্ন, মহারাজা অন্যান্য কর্ম্মচারীসহ নির্দ্দিষ্ট দিনে কাগজাদিসহ নবাব মীরকাসিম বাহাদুরের দরবারে উপসি’ত হইয়া ক্রমে ক্রমে নিকাশ বুঝ দিতে আরম্ভ করিলেন। সাতদিন পর্য্যন্ত দরবারে, নবাব ও মহারাজার পক্ষের কর্ম্মচারীগণ মধ্যে নিকাশ নিয়া ভারি হুলুস’ুল আরম্ভ হইল; পরে সাব্যস্ত হইল, মহারাজা ২ লক্ষ টাকা তশ্রুপ করিয়াছেন। নবাব ইহা জানিয়া অতি ক্রোধান্বিত হইলেন এবং মহারাজকে বলিলেন, “যদি অচিরে টাকা না দিন তাহা হইলে কারাদণ্ডের আদেশ দিব।” ঐদিন মহারাজা বাসায় আসিয়া নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন এবং অন্য গতি নাই মনে করিয়া- বিনা অপরাধে কারাদণ্ড হইবে এবং নিতান্ত অসম্মানিত হইবেন ভাবিয়া- অশ্রুজল বিসর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিলেন। এদিকে কীর্ত্তিনারায়ণ সমস্ত কথা অবগত হইয়াছিলেন। তিনি সাহসের উপর নির্ভর করিয়া মহারাজার সমীপে উপসি’ত হইয়া বলিলেন, “মহারাজ, আপনি ব্যাকুল হইবেন না, উর্দ্ধতন উভয় পক্ষীয় কর্ম্মচারীগণ ভ্রমে পড়িয়া আপনার দেনা সাব্যস্ত করিয়াছে বলিয়া আমার বিশ্বাস। আপনি ৫/৬ দিনের সময় লউন, আমি দেখাইতে পারিব, আপনারই ২ লক্ষ টাকা পাওয়ানা হইয়াছে।” মহারাজা বলিলেন, “তুমি অতি অল্প বয়স্ক লোক, আমার পক্ষীয় বড় বড় কর্ম্মচারীগণ আমারই দেনা বলিতেছে, আর তুমি অন্যরূপ বলিতেছ, ইহা কি সম্ভব?” তথাপি কীর্ত্তিনারায়ণ পুনঃ পুনঃ মহারাজকে সময় লইবার জন্য অনুরোধ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন মহারাজা নবাব বাহাদুরের নিকট প্রার্থনা জানাইলেন যে তাঁহাকে সাত দিনের সময় দিতে হইবে, পুনরায় নিকাশ বুঝ দিয়া যদি তাঁহার দেনা হয় ও টাকা দিতে না পারেন তবে কারাদণ্ড ভোগ করিবেন। নবাব এই কথায় সম্মতি প্রকাশ করিলেন, মহারাজা কীর্ত্তিনারায়ণকে সমস্ত জানাইলেন। এদিকে কীর্ত্তিনারায়ণ সমস্ত কাগজাদি তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়া কর্ম্মচারীদের ভুল বাহির করিতে লাগিলেন এবং ক্রমে ক্রমে মহারাজার পাওনা সাব্যস্ত করিলেন দেখিয়া মহারাজা নিতান্ত সুখী হইলেন কিন’ উর্দ্ধতন কর্ম্মচারিগণ আশ্চয্য ও লজ্জিত হইলেন। কীর্ত্তিনারায়ণকে দেখিয়া নবাব মনে মনে ভাবিলেন, এই অল্প বয়স্ক ছেলে কি প্রকারে নিকাশ বুঝ দিবে। নবাবের সরকারী কর্ম্মচারিগণও কীর্ত্তিনারায়ণকে দেখিয়া মনে মনে উপহাস করিতে লাগিলেন। পরে নিকাশ বুঝ হইতে আরম্ভ হইল, কীর্ত্তিনারায়ণ প্রত্যেক পদে পদে নবাবের কর্ম্মচারীদিগকে তাঁহাদের ভুল দেখাইতে আরম্ভ করিলেন। এমনভাবে তিনি সব বুঝাইতেছিলেন যে, নবাব ও অমাত্যবর্গ, দরবারসি’ত সমস্ত লোক, এমন কি মহারাজাও বিস্ময়ান্বিত হইয়াছিলেন। এই ভাবে ৫ দিন পর্যন্ত নবাবের দরবারে উভয় পক্ষ মধ্যে বহু তর্ক বিতর্ক হইতে লাগিল, কিন’ পরে নবাবপক্ষীয় কর্ম্মচারিগণ কীর্ত্তিনারায়ণের কথা না মানিয়া পারিলেন না এবং সাব্যস্ত হইল যে, মহারাজারই কয়েক লক্ষ টাকা পাওনা এবং নবাব বাহাদুরের দেনা। তখন নবাব কীর্ত্তিনারায়ণকে বহু ধন্যবাদ দিতে আরম্ভ করিলেন এবং নবাবের কর্ম্মচারিগণ বিশেষ লজ্জিত হইলেন।
নবাব মহারাজার পাওনা টাকা দিতে আদেশ দিলেন এবং এই ছেলেটিকে (কীর্ত্তিনারায়ণকে) তাঁহার সদরে রাখিয়া যাইবার জন্য অনুরোধ করিলেন। মহারাজা আগামী কল্য ইহার উত্তর দিবেন জানাইয়া বাসায় আসিলেন এবং কীর্ত্তিনারায়ণকে তাঁহার পুরস্কার স্বরূপ চাকলে বদরাসন, বরহানগঞ্জ দান করিয়া দানপত্র লিখিয়া দিলেন। মহারাজা কীর্ত্তিনারায়ণকে পুত্রের ন্যায় দেখিতে আরম্ভ করিলেন এবং নবাব বাহাদুরের আদেশ তাঁহাকে জ্ঞাপন করিয়া তাহা পালন করা যে একান্ত কর্ত্তব্য তাহা বুঝাইয়া বলিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ মহারাজকে ছাড়িয়া থাকিতে হইবে মনে ভাবিয়া এ প্রস্তাবে প্রথমত: সম্মতি দিতে পারিলেন না, পরে মহারাজা পুন: পুন: বলাতে কীর্ত্তিনারায়ণ নবাবের সদরে থাকিতে স্বীকৃত হইলেন। নবাব বাহাদুরকে এ সংবাদ জানাইয়া কীর্ত্তিনারায়ণের সঙ্গে একটী চাকর ও পাটক রাখিয়া, মহারাজা বিদায় নিয়া রাজনগরে উপসি’ত হইলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ দরবারে সদস্য পদে নিযুক্ত হইলেন। কিছুকাল গত হইলে কীর্ত্তিনারায়ণের কার্য্যকুশলতায় নবাব বাহাদুর ক্রমেই সন’ষ্ট হইতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের গভার্ণার করিয়া জাহাঙ্গিরনগরে তাঁহার সীট করিয়া দিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার নানাস’ানে ঘুরিতে আরম্ভ করিয়া শাসনের সুবন্দোবস্ত করিতে আরম্ভ করিলেন এবং ক্রমেই নবাবকে সুখী করিতে সমর্থ হইলেন। এই প্রকারে নানা স’ানে ঘুরিয়া তিনি বহু বে-বন্দোবস্তী সম্পত্তির বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। নবাব মীরকাসিম বাহাদুর অতীব সুখী হইয়া কীর্ত্তিনারায়ণকে তাঁহার ওয়ারিশ ক্রমে “লালা” খেতাবীতে ভূষিত করিলেন। তদবধি কীর্ত্তিনারায়ণের বংশে “লালা” উপাধি চলিয়া আসিতেছে।
কীর্ত্তিনারায়ণ বিনামীতে নানা জিলায় নানা স’ানে সম্পত্তি খরিদ করিয়াছিলেন, তাঁহার কৃত সম্পত্তির নাম দিয়াছিলেন পরগণে বৈকুণ্ঠপুর। গয়া, পাটনা, খুলনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ত্রিপুরা এই সকল জিলায় তিনি বহু সম্পত্তি করিয়াছিলেন, কিন’ ক্রমে ক্রমে তাহা হস্তচ্যুত হইয়া বর্ত্তমানে তাহার চতুর্থাংশের এক অংশও নাই। লালা কীর্ত্তিনারায়ণ কিছুকাল পরে স্বগ্রাম রায়েসবরে আসিয়া উহার “শ্রীনগর” নাম দিয়া ঐ স’ানে দালানাদি প্রস’ত করাইয়া বাস করিতে আরম্ভ করিলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ মন সি’র করিলেন, রাজা রাজবল্লভের রাজবাটীতে যে সব এমারতাদি, দেবালয় দেখিয়াছেন তাহার অনুকরণে কিছু কাজ করাইবেন। তদনুসারে “শিববাড়ী” নামকরণে ঐ স’ানে দ্বাদশটি মঠ নির্ম্মাণ করাইয়া দ্বাদশটি শিব ঐ মঠে প্রতিষ্ঠা করিলেন এবং ঁশ্রীশ্রীঅনন্তদেব নামে শালগ্রামচক্র এবং অষ্টধাতু নির্ম্মিত ঁশ্রীশ্রী কাত্যায়নী দেবীর মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশ্যে এক মন্দির তৈয়ার করাইয়া উহাতে ঁশ্রীশ্রীকালাচান্দ, ঁশ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবী ও নানা দেবদেবীর মূর্ত্তি স’াপন করিলেন এবং সমস্ত বৈকুল্‌ঠপুর জমিদারী ঁশ্রীশ্রীঅনন্দদেব নামে উৎসর্গ করিলেন। তিনি নিয়মিতরূপে ঐ সকল দেবদেবীর দৈনিক সেবাপূজার ব্যবস’া করিয়া দিলেন এবং প্রতি মঙ্গলবার, প্রতি অমাবস্যায় ও সংক্রানি-তে বলির ব্যবস’া করিলেন, এবং একটা অতিথিশালা স’াপন করিয়া দিলেন।
তিনি বাড়ীর চারি কোণে চারিটী বুরুজ নির্ম্মাণ করাইয়া তাহাতে প্রহরী থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। লালা কীর্ত্তিনারায়ণের মোহনমালা নামে একমাত্র কন্যা ছিলেন, তাঁহাকে সৎ পাত্রে বিবাহ দিবার জন্য তিনি উদ্যোগী হইলেন। মনে ভাবিয়াছিলেন, কন্যার বিবাহে মহারাজ রাজবল্লভকে নিমন্ত্রণ করিয়া শ্রীনগর গ্রামে আনিবেন, কিন’ তখনই মনে হইল, যদি বা মহারাজা শুভাগমন করেন, তাহা হইলে তাঁহার বসিবার স’ান কোথায় হইবে? মন বড় আকুল হইল, তখনই সি’র করিলেন, এজন্য বৃহৎ আকারে এমন একটা দালান প্রস’ত করিতে হইবে, যাহাতে বাদশাহ বসিয়া থাকেন। যথাসময়ে তদ্রুপ এক বৃহৎ দালান প্রস’ুত করিয়া তাহার নাম দিলেন “সাহানিস” অর্থাৎ যাহাতে বাদশাহ বসেন। ঐ দালান প্রস’ত হইলে পর, লালা কীর্ত্তিনারায়ণ স্বয়ং রাজনগরে মহারাজার নিকট উপসি’ত হইয়া নিমন্ত্রণের আদেশ প্রার্থনা করিলেন। বহুকাল পর লালা কীর্ত্তিনারায়ণকে দেখিয়া মহারাজা অতীব আহ্লাদিত হইয়া কীর্ত্তিনারায়ণের কীর্ত্তিকলাপ ও কার্য্যাদি অবগত হইলেন। মহারাজা নিজের অসুস’তা নিবন্ধন লালা কীর্ত্তিনারায়ণের কন্যার বিবাহে যোগদান করিতে পারিবেন না বলিয়া জানাইলেন। কীর্ত্তিনারায়ণ দুঃখিত হইয়া বাড়ী ফিরিলেন এবং কন্যার বিবাহ মহাসমারোহে নির্ব্বাহ করিলেন। কালক্রমে মঠসহ দ্বাদশ শিব একেবারে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। ঁশ্রীশ্রীঅনন্তদেব বিগ্রহ ও ঁশ্রীশ্রীকাত্যায়নী দেবী অদ্যাবধি শ্রীনগর বাড়ীতে আছেন।
চারি কোণের চারিটী বুরুজ মধ্যে একটার মাত্র ধ্বংসাবশেষ আছে। সাহানিস নামা দালানেরও ধ্বংসাবশেষ মাত্র আছে। লালা কীর্ত্তিনারায়ণের কীর্ত্তির মধ্যে কেবল দেবালয়, অতিথি-শালা, বহু পৌরাণিক গ্রনে’র কীটদষ্ট কিছু এখন বিদ্যমান আছে। লালা কীর্ত্তিনারায়ণের একমাত্র কন্যাসন্তান মোহনমালা ও তাঁহার স্ত্রী ভুবনেশ্বরীকে বর্ত্তমান রাখিয়া, ৫০ বৎসর বয়সকালে তিনি পরলোক গমন করেন। তৎপর গৃহে আত্মবিরোধ উপসি’ত হয়। লালা কীর্ত্তিনারায়ণের দুই ভ্রাতা একত্র হইয়া ভুবনেশ্বরীকে সমস্ত সম্পত্তি হইতে বেদখল রাখেন এবং নানা প্রকার মামলা সৃষ্টি হয়। দেবরদ্বয় ভুবনেশ্বরীকে মাত্র এক পোয়া চাউল ও কাঁচাকলা আহারের ব্যবস’া করিয়া দিলেন। ভুবনেশ্বরীর পক্ষে মাত্রা তাঁহার ভ্রাতা ও একটী কর্ম্মচারী ছিল। তাহাদিগকে বাধ্য করিবার জন্য শিবনারায়ণ ও রামভদ্র বহু চেষ্টা করেন, কিন’ সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হইলে পর, তাহাদিগকে দুই আনা অংশ দিবেন স্বীকার করেন। তাহা সত্ত্বেও উক্ত ভ্রাতা ও কর্ম্মচারী ভুবনেশ্বরীর পক্ষেই থাকিয়া ভুবনেশ্বরীর দ্বারা সমস্ত সম্পত্তি লালা কীর্ত্তিনারায়ণের স্বোপার্জিত বলিয়া আদালতে নালিশ দায়ের করেন। সুপ্রিম কোর্ট পর্য্যন্ত ঐ মামলা চলিতে থাকে। মামলার খরচ জন্য ভুবনেশ্বরীর স্ত্রীধন সমস্ত ব্যয় হইয়া গেল, ভুবনেশ্বরী একেবারে নিঃস্ব হইয়া পড়িলেন, কিন’ তিনি সমস্ত কোর্টের মামলায় জয়ী হইলেন এবং সমস্ত সম্পত্তি তাঁহার স্বামী কীর্ত্তিনারায়ণের স্বোপর্জ্জিত বলিয়া সি’র হইল। তিনি সমস্ত সম্পত্তিতে দখল লইলেন।
পরে শিবনারায়ন ও রামভদ্র একেবারে সম্পত্তিহারা হইয়া পড়িলে দুই ভ্রাতা ভুবনেশ্বরীর পায়ে পড়িয়া অপরাধ স্বীকার করিয়া সম্পত্তির কতকাংশের জন্য প্রার্থী হইরেন, এবং কান্নাকাটী করিতে আরম্ভ করিলেন। ভুবনেশ্বরী ইহাতে নিতান্ত অসি’র হইলেন; একেই ত স্ত্রী জাতি স্বাভাবিক দয়ালুস্বভাবা তাহাতে আবার দেবর দ্বয়ের দৈন্যদশা দেখিয়া তিনি বড়ই ব্যাকুলা হইলেন এবং ভ্রাতা ও কর্ম্মচারীর সহিত পরামর্শ করিয়া কি করিবেন চিন্তা করিতে লাগিলেন। ভ্রাতা ও কর্ম্মচারীর উপদেশে দুই দেবরকে সমস্ত সম্পত্তির দুই আনা দিবেন সি’র করিয়া দেবরদিগকে জানাইলে দেবরগণ তাহাতে স্বীকৃত হইলেন না, আরও কান্নাকাটী করিয়া একদিন উপবাস রহিলেন। পরে ক্রমে ক্রমে ভ্রাতা ও কর্ম্মচারীর অমতে সম্পত্তির অদ্ধাংশ দিতে তিনি স্বীকার করিলেন। ইহাতে তাঁহার ভ্রাতা ও কর্ম্মচারী অতীব ক্ষুন্ন হইয়া বলিয়াছিলেন, “যদি একান্তই সম্পত্তির অদ্ধাংশ দিতে হয় তাহা হইলে তোমাকে সদর জমা দিবে এই ভাবে দেও।” দেবরদ্বয় তাহাতেও নারাজ হইয়া ভুবনেশ্বরীর পায় লুটাইয়া পড়িলেন। ভুবনেশ্বরী দয়ার্দ্র হইয়া দেবরদের কথাতেই স্বীকৃতা হইলে ভ্রাতা তৎক্ষণাৎ ভুবনেশ্বরীকে ত্যাগ করিয়া দেশে চলিয়া গেলেন, ভুবনেশ্বরীর নানা প্রকার অনুনয় বিনয় সত্বেও তথায় রহিলেন না। কিন’ ভুবনেশ্বরী তাঁহার ভ্রাতাকে কিছু বৃত্তি নির্দ্ধারণ করিয়া কিছু সম্পত্তি দিলেন। যে কর্ম্মচারী তাঁহার এত বিশ্বাসী ছিলেন তিনিও অতিশয় ক্রোধান্বিত হইয়া ভুবনেশ্বরীকে বলিয়াছিলেন, “যাহার কাছা মাথার উপর এবং যাহার বুদ্ধি নাই এইরূপ লোকের চাকুরী করিব না।” ইহা বলিয়া তিনিও চলিয়া গেলেন এবং ভুবনেশ্বরীকে অভিসম্পাত করিলেন, “যতকাল পর্য্যন্ত তোমার বংশধর ও তোমার দেবর দ্বয়ের বংশধর জীবিত থাকিবে ততকাল পর্য্যন্ত গৃহবিচ্ছেদ বর্ত্তমান থাকিবে।” যদিও কর্ম্মচারী এইরূপ অভিসম্পাত করিয়াছিলেন তবুও ভুবনেশ্বরী তাঁহাকে কিছু সম্পত্তি বৃত্তি স্বরূপ দান করিয়াছিলেন।
লালা কীর্ত্তিনারায়ণের পুত্রসন্তান না থাকায় কৃষ্ণকুমার বসুকে ভুবনেশ্বরী দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন। তিনি কৃষ্ণকুমারকে যথাযথ বিদ্যাশিক্ষা দিলেন এবং যথাসময়ে তাঁহার উপর সম্পত্তির শাসন সংরক্ষণের ভার ন্যাস্ত করিলেন। লালা কৃষ্ণকুমার দেখিলেন ও জানিলেন যে তাঁহার পিতা লালা কীর্ত্তিনারায়ণ মোহনমালাকে তাঁর ভরণপোষণের উপযুক্ত কোন সম্পত্তি দান বা তাঁহার জন্য তেমন কোন বৃত্তি নির্দ্ধারণ করিয়া যান নাই এবং তাহার মাতাও কোন সম্পত্তি তাঁহার কন্যাকে দেন নাই। লালা কীর্ত্তিনারায়ণ জীবিত থাকাকালে মোহনমালা তাঁহার আদরের কন্যা ছিলেন। মোহনমালা পিতাকে আবদার করিয়া বলিয়াছিলেন, “বাবা, আমাকে পান খাইবার জন্য কিছু দিন।” তাহাতে লালা কীর্ত্তিনারায়ণ মোহনগঞ্জ নামক এক গ্রাম তাহাকে (কন্যাকে) দান করিয়াছিলেন। লালা কৃষ্ণকুমার দেখিলেন, মোহনগঞ্জের আয় মোহনমালা ভগ্নীর সংসার নির্ব্বাহ করার পক্ষে অপ্রচুর। ইহা বুঝিয়া তিনি মোহনমালাকে চাকলে বদরাসন বরহানগঞ্জের দুই আনা অংশ অধীন-হাওলা করিয়া দান করিলেন। লালা কৃষ্ণকুমারও প্রজাবৎসল এবং অতি সাহসী পুরুষ ছিলেন, নিজ সম্পত্তি নিজেই শাসন সংরক্ষণ করিতেছিলেন, পরে নানা কারণে বহু সম্পত্তি ডা: ওয়াইজ সাহেবের নিকট বহু টাকা ধার করিয়া, ইজারা দিলেন। তিনিও পিতার ন্যায় অতিথিশালা দেবার্চ্চনাদি ক্রিয়ার প্রতি বিশেষ মনোযোগী হইয়াছিলেন। তিনি অতিথিশালার বিশেস সুবন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। যখন শিবনারায়ণের পুত্র অতিথি সৎকার করিতে অসমর্থ হইয়া পড়িলেন তখন লালা কৃষ্ণকুমার শিবনারায়ণের পালায় ব্রহ্মপুত্র স্নান উপলক্ষে যে অসংখ্য অতিথি হইত তাঁহাদের সেবার ভার নিজে গ্রহণ করিলেন। লালা কৃষ্ণকুমার অতি ব্যয়ী লোক ছিলেন, ডা: ওয়াইজ সাহেবের নিকট সম্পত্তি ইজারা দিলে পর, উক্ত সাহেব প্রজা পীড়ন করিয়া তাঁহার টাকা উঠাইবার প্রয়াসী হইলে, প্রজাগণ চাঁদা ধরিয়া লালা কৃষ্ণকুমারের সমগ্র দেনা দিয়া সম্পত্তি সাহেবের হস্ত হইতে খালাস করিবার জন্য লালা কৃষ্ণকুমারকে জানাইলে তিনি সাহেবের নিকট টাকা দিয়া সম্পত্তি খালাস করিবার প্রস্তাব করিয়া পাঠান। সাহেব তাহাতে অস্বীকার করেন; তদ্দরুণ মামলা উপসি’ত হইয়াছিল। লালা কৃষ্ণকুমার তাঁহার মাতার শ্রাদ্ধ উপলক্ষে “দান সাগর” শ্রাদ্ধ করিয়া বহু টাকা ঋণী হন। এই অবস’ায় লালা কৃষ্ণকুমার পুত্র লালা জগদ্বন্ধু বসু ও কন্যা আনন্দময়ী ও স্ত্রী জগৎতারাকে বর্ত্তমান রাখিয়া পরলোকে গমন করেন। লালা জগদ্বন্ধু পিতার শ্রাদ্ধাদি অতি সমারোহে নির্ব্বাহ করেন এবং তদ্দরুণ আরও বহু ঋণগ্রস’ হন। ডা: ওয়াইজ সাহেবের সঙ্গে মামলা করিায়া তিনি ইজারার ম্যাদের পূর্ব্বেই সমস্ত সম্পত্তি খালাস করিয়া আনেন এবং নিজেই তাহার শাসন সংরক্ষণ করেন। লালা জগদ্বন্ধু অতি ধর্ম্মপরায়ণ, শান্ত, ধর্ম্মভীরু, মাতৃভক্তির আদর্শ ছিলেন। অতিথি ও দেবসেবার প্রতি তাঁহার একান্ত ভক্তি ছিল। দৈনিক পূজা না হইতে কিংবা অতিথি সেবা না হইতে তিনি নিজে আহার করিতেন না। তিনি অতি দয়ালু প্রকৃতির লোক ছিলেন। ব্রহ্মপুত্র স্নান উপলক্ষে তাঁহার অতিথিশালায় অসংখ্য যাত্রী হইত। এক বৎসর ব্রহ্মপুত্র স্নান উপলক্ষে প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল- অতিথিদিগকে চাউল, ডাইল, মাছ-তরকারী, মোসল্যা, পান সুপারি, তামাক, হাঁড়ি কাঠ দেওয়া হইত।
সেবারে অতিথির রাঁধিবার কাঠে নিতান্ত অকুলন হইয়া পড়িলে লালা জগদ্বন্ধু একেবারে অসি’র হইয়া পড়িয়াছিলেন। বহু প্রজার গৃহাদি অর্থ দ্বারা খরিদ করিয়া আনিয়য়াও কাঠের সংকুলান করিতে না পারিয়া অতিথি- সেবা হইল না ভাবিয়া তিনি ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন। পরে, সাহানিসনামা দালানের সন্মুখভাগে যে এক বৃহৎ নাটঘর ছিল, তাহা ভাঙ্গিবার আদেশ দিরেন এবং উহা দ্বরা জ্বালানি কাঠ প্রস’ত করাইয়া ভগবানের কৃপায় অতিথি সেবা নির্ব্বাহ করিলেন। সেবারে যশোহর জিলার অন্তর্গত নড়াইল নিবাসী অতি প্রাচীন জমিদার স্বর্গীয় রতন বাবুর মা বহুলোক নিয়া পালকীতে আসিয়া শ্রীনগর গ্রামের নিকটে ছাউনী করিয়াছিলেন। শ্রীনগর বাজারে আহারীয় সামগ্রী আনিবার জন্য তাঁহার লোক গমন করিলে তথায় কোন আহার্য্য দ্রব্যই খরিদ করিতে পারিল না, কারণ ব্রহ্মপুত্র স্নানের যাত্রীদের নিকট কোন দোকানদার কিছু বিক্রি করিতে পারিবে না, লালা জগদ্বন্ধুর এইরূপ আদেশ থাকিত। ঁরতন বাবুর মা মাঠে ছাউনী করিয়া আছেন, লালা জগদ্বন্ধু জানিতে পারিয়া স্বয়ং যাইয়া রতন বাবুর মাকে বহুপ্রকারে অনুনয়-বিনয় করিয়া- এমন কি ‘মা’ সম্বোধন করিয়া নিজ বাড়ীতে আনিয়া তাঁহার ও তাঁহার সঙ্গীয় লোকদিগের যথেষ্ট আদর-আপ্যায়ন করিয়াছিলেন। ঁরতন বাবুর মা এই সব ব্যাপার দেখিয়া ও এত লোকের সমাগম ও এত লোকের আহারাদি এবং নাটঘর ভাঙ্গিয়া অতিথির কাঠের সংস’ান করা ইত্যাদি দেখিয়া বলিয়াছিলেন, “এই স’ানই পুণ্য ক্ষেত্র, আমার ব্রহ্মপুত্র স্নানের কাজ এখানেই হইয়াছে”। লালা কৃষ্ণকুমার তাঁহার কন্যা আনন্দময়ীকে রাজা বসন্ত রায়ের সন্তান টাকী নিবাসী ঁ দ্বারকানাথ গুহ রায় মহাশয়ের নিকট বিবাহ দিয়া হাঁহাকে শ্রীনগর গ্রামে বাড়ী করিয়া দেন। লালা জগদ্বন্ধু আনন্দময়ীকে ৫০০ টাকা আয়ের সম্পত্তি দান করিয়াছিলেন। স্বর্গীয় দ্বরকানাথ গুহ রায়ের ওয়ারিশগণ বর্ত্তমান আছেন। তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রনাথ গুহ রায় বড় বেতনের চাকুরী করিতেছেন, কিন’ তিনিও দ্বরাকানাথের বর্ত্তমান অন্যান্য ওয়ারিশগণের ন্যায় জন্মভূমি শ্রীনগরে আসেন না। সকলেই বিদেশে বাস করিতেছেন।
লালা জগদ্বন্ধুর নামে অনেকে অনেক বিষয় মানত করিত। কাহারও গাছে ফল না হইলে জগদ্বন্ধুর নামে মানত করিলে অফলন্ত বৃক্ষে ফল ধরিত শুনা গিয়াছে। কোন ভদ্রলোক বেদনার ব্যারামে নিতান্ত কষ্ট পাইয়া, বহু চিকিৎসা করিয়া কোন ফলা না পাইয়া, ঁতারকেশ্বরে হত্যা দেবার পর আদেশ হইয়াছিল জগদ্বন্ধুর প্রসাদ গ্রহণ করিলে আরোগ্য হইবে, ফলে তাহাই ঘটিতে দেখা গিয়াছে।
লালা জগদ্বন্ধুর ২ পত্নী ছিলেন, প্রথম পত্নীর গর্ভে কোন সন্তান হইল না বলিয়া দ্বিতীয় পত্নী গ্রহণ করেন, তাঁহার গর্ভে দুই পুত্র, তিন কন্যা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। লালা জগদ্বন্ধু ১২৮৬ সনের জৈষ্ঠ মাসে বৃদ্ধ মাতাকে, পত্নীদ্বয়কে, পুত্রদ্বয়কে এবং তিন কন্যাকে বর্ত্তমান রাখিয়া পরলোক গমন করেন। সে সময় দুই পুত্র লালা রাজেন্দ্র ও লালা ব্রজেন্দ্র নাবালক ছিলেন। লালা রাজেন্দ্রের বয়স ১৪ বৎসর ও লালা ব্রজেন্দ্রের বয়স ৪ বৎসর ছিল। লালা জগবন্ধু ২ কন্যা ও এক পুত্রের বিবাহ কার্য্য তাঁহার জীবিতাবস’ায় সম্পাদন করিয়াছিলেন। লালা রাজেন্দ্র পৈতৃক দেনায় জড়ীভূত হইয়াছিলেন, তিনি ১৫/১৬ বৎসরেই অধ্যয়নাদি ত্যাগ করিয়া নিজ সম্পত্তিতে কিরূপ কাজ হইতেছে তাহা দেখিতে আরম্ভ করিলেন, এবং পৈতৃক দেবসেবা, অতিথিশালা বজায় রাখিয়া পৈতৃক দেনা শোধ দিতে আরম্ভ করিলেন। ১০/১২ বৎসর মধ্যে ক্রমে ক্রমে পৈতৃক দেনা শোধ দিয়া তিনি ষ্টেটের অনেক উন্নতি করিয়াছেন। তিনি সরিকগণের যোগে শ্রীনগর গ্রামে পিত্তলের এক রথ স’াপন করিয়াছেন এবং উক্ত রথযাত্রা উপলক্ষে প্রতি সন এক বৃহৎ মেলা হইয়া আসিতেছে। লালা রাজেন্দ্রের মাতা বহু তীর্থ ভ্রমণ করিয়াছিলেন, শ্রীনগর গ্রামে বহু অর্থ ব্যয় করিয়া তিনি একটী শিবমন্দির ও শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করিয়া ৮৩ বৎসর বয়সে, ১৩৩৮ সনের চৈত্র সংক্রান্তী দিনে, সজ্ঞানে মানবলীলা সংবরণ করেন। শ্রীনগর গ্রামে জলকষ্ট নিবারণ জন্য একটী “টিউব ওয়েল” স’াপন করিবার জন্য তিনি টাকা রাখিয়া গিয়াছেন।
লালা কীর্ত্তিনারায়ণের দুই ভ্রাতা, রামভদ্র ও শিবনারায়ন, ভুবনেশ্বরী হইতে জমিদারীর অর্দ্ধাংশ পাইবার পর, আর কোন চাকুরী করেন নাই। রামভদ্রের লক্ষ্মীকান্ত ও রাজচন্দ্র নামে দুই পুত্র ছিল। লক্ষ্মীকান্তেরও দুই পুত্র, পদ্মলোচন ও রাজীবলোচন। রাজীবলোচন নিঃসন্তান ছিলেন, তাঁহার পরলোকগমনের পর, বাবু শ্রীনাথ বসু রাজীবলোচনের অংশের মালিক হন। বাবু শ্রীনাথ বসু তেজস্বী ও বুদ্ধিমান লোক ছিলেন, জমিদারী শাসন সম্বন্ধে তাহার বিশেষ নৈপুণ্য ছিল। তিনি নিজেই জমিদারী শাসন সংরক্ষণ করিতেন এবং গহনার কারবারও করিতেন। লালা জগদ্বন্ধুর সঙ্গে যদিও নানাপ্রকার বিষয়াদি নিয়া নানা মামলা মোকদ্দমা হইত তথাপি বাবু শ্রীনাথ বসু তাঁহাকে বিশেষ ভক্তিশ্রদ্ধা করিতেন, লালা জগদ্বন্ধুও শ্রীনাথকে স্নেহ করিতেন। প্রজার বিচার উভয়ে একত্র হইয়া করিতেন। লালা জগদ্বন্ধুর স্নেহ শ্রীনাথ বাবুর উপর ছিল বলিয়া প্রজাগণ শ্রীনাথকে ভয় করিত। লালা জগদ্বন্ধুর পরলোকগমনের পর বাবু শ্রীনাথ কিরূপে শ্রীনগরের সম্মান রক্ষা করিবেন, তাহা ভাবিয়া সর্ব্বদা সতর্ক থাকিতেন। এই ভাবনা তাঁহার হৃদয়ে সর্ব্বদা জাগরূক থাকিত বলিয়া তিনি প্রায়ই মনে অশান্তি ভোগ করিতেন। এই অশান্তি ক্রমে বাড়িতে থাকিলে তিনি ঁকাশীধামে যাইয়া বাস করিতে থাকেন এবং ৬১ বৎসর বয়:ক্রমকালে কাশীপ্রাপ্ত হন। তাঁহার জীবিতাবস’ায় তিনি পৈতৃক দেবাচ্চনাদি ক্রিয়া এবং অতিথিশালা রক্ষণাদির ব্যয় নিজের অংশানুসারে বহন করিয়াছেন। তাঁহার স্মরণশক্তি অসাধারণ ছিল, বহু পৌরাণিক গ্রনে’র শ্লোকাদি তিনি অনর্গল মুখস’ বলিতে পারিতেন।
রামচন্দ্রের দ্বিতীয়পুত্র রাজচন্দ্র বসুর ঔরসজাত কোন পুত্র ছিল না, তিনি রামকুমার বাবুকে দত্তক গ্রহণ করেন। বাবু রামকুমার বসুও অতি তেজস্বী পুরুষ ছিলেন, তাঁহার অপর নাম ছিল অগ্নিকুমার বসু। শ্রীনগর গ্রামে হাটবাজার তিনি বসাইয়া গিয়াছেন, অদ্যাবধিও সে হাট বর্ত্তমান আছে। বিক্রমপুর মধ্যে শ্রীনগরের হাট একটী প্রসিদ্ধ হাট। রামকুমার বাবু ষোলঘরের হাট ভাঙ্গিয়া দিয়াছিলেন, তদুপলক্ষে একটী লোককে হুকুম দিয়া হত্যা করিয়া ফেলেন, তজ্জন্য বাবু রামকুমারের জেল হইয়াছিল। তখনকার জেলে কয়েদী ইচ্ছা করিরে তাহার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দুর্গোৎসব, নাচ, গান প্রভৃতি সবই করাইতে পারিতেন। রামকুমার বাবু তদ্রূপভাবে কিছুদিন জেলে ছিলেন। তিনি সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন। তাঁহার কোন ঔরসজাত পুত্র ছিল না, তিনি বাবু রসিকলালকে দত্তক-পুত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন। রসিকলার বাবু অল্প বয়সেই এক পুত্র ও এক কন্যা রাখিয়া স্ত্রী গঙ্গামণিকে সমস্ত সম্পত্তি দান করিয়া পরলোক গমন করেন।
শিবনারায়ণ বসুর দুই পুত্র ছিল, বাবু নবকিশোর ও বাবু রামকানাই। শিবনারায়ণ পার্শী ভাষায় একজন পণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার পৌত্র বাবু দীনবন্ধু বসু অতি প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন এবং একজন কবি বলিয়া পরিচিত ছিলেন। তিনি কবিগান ভালরূপে রচনা করিতে পারিতেন, নিজের একটা কবির দল ও বহু লাঠীয়াল তাঁহার ছিল, নানা প্রকার মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া তিনি বহু ঋণগ্রস’ হইয়াছিলেন, তদ্দরুণ তাঁহার সম্পত্তি একেবারে ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল। তৎপুত্র বাবু সুখময় বসুরও কবিতা রচনাশক্তি বেশ ছিল, তাঁহার কোন পুত্রসন্তান ছিল না। দীনবন্ধু বাবুর সময়ে, হঠাৎ এক উর্দ্ধবাহু সাধু ভোরবেলা আসিয়া দাঁড়াইয়া আছেন দেখা যায়। লোকে তাঁহাকে জানাইলে সাধুকে আনিবার জন্য তিনি হুকুম দেন। লোক যাইয়া সাধুকে দীনবন্ধু বাবুর নিকট যাইতে হইবে জানাইলে সাধু কোন উত্তর করিলেন না- সাধু মৌনী ছিলেন। কেহ তাঁহাকে ধরিতে সাহসী হইল না। দীনবন্ধু বাবু ক্রোধান্বিত হইয়া সাধুকে ধরিয়া আনিয়া নানাপ্রকারে তাঁহাকে খাওয়াইবার চেষ্টা ও উৎপীড়ন করিলেন, সাধু অভিসম্পাত করিয়াছিলেন, “তোর বংশ ধ্বংস হইবে, তুই নিরন্ন হবি”। কালে তাহাই হইয়াছিল।
রামকানাই বাবুর পুত্র চন্দ্রকুমার বাবু, ইহার বিষয়বুদ্ধি ছিল না, তদ্দরুণ তিনি তাঁহার সম্পত্তি নষ্ট করিয়া গিয়াছেন।

শ্রীনগরের লালা বংশের এক কুষ্টিনামা এই সঙ্গে দেওয়া গেল।

কংসনারায়ণ বসুর তিন পুত্র
১) লালা কীর্ত্তিনারায়ণ বসু
২) রামভদ্র বসু
৩) শিবনারায়ণ বসু
লালা কীর্ত্তিনারায়ণ বসুর পালিত পুত্র লালা কৃষ্ণকুমার বসু, তার পুত্র লালা জগদ্বন্ধু বসু। জগদ্বন্ধু বসুর দুই পুত্র রাজেন্দ্র বসু ও ব্রজেন্দ্র বসু। রাজেন্দ্র বসুর পুত্র হলেন প্রদ্যোতকুমার বসু ও নাতি হলেন পবিত্র কুমার বসু।
রামভদ্র বসুর দুই পুত্র লক্ষীকান্ত বসু ও রাজচন্দ্র বসু। লক্ষীকান’ বসুর দুই পুত্র পদ্মলোচন ও রাজীবলোচন। পদ্মলোচনের পুত্র শ্রীনাথ বসু ও নাতি কালীনাথ বসু। কালীনাথ বসুর তিন পুত্র- মন্মথ, নৃপেন্দ্র ও জিতেন্দ্র বসু।
রাজচন্দ্র বসুর পুত্র রামকুমার, তার পুত্র রসিকলাল, তার পুত্র হরলাল বসু। হরলাল বসুর ছয় পুত্র- মুকুন্দ, প্রিয়লাল, যশোদা, মাখন, মতিলাল ও নিকুঞ্জ বসু।
শিব নারায়ন বসুর দুই পুত্র নবকিশোর বসু ও রামকানাই বসু। নবকিশোর রায়ের একপুত্র দীনবন্ধু ও দুই নাতি সুখময় ও রেবতী বসু। সুখময় বসুর ছয় পুত্র- কালীপ্রসন্ন, যদু, নিধু, চিত্রা, গোপাল ও সতীশ রামকানাই বসুর এক পুত্র চন্দ্রকুমার

মুজিব রহমান, প্রধান উপদেষ্টা, শ্রীনগর নিউজ: লালা রাজেন্দ্রকুমার বসু নিজ পরিবারের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লিখতে গিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন নি। তিনি যথাসম্ভব ইতিবাচক বিষয় তুলে ধরেছেন এবং নেতিবাচক বিষয় পরিহার করেছেন। ইতিহাসবিদ হিমাংশুমোহন চট্টোপাধ্যায় তার বিক্রমপুর ইতিহাসগ্রনে’র দ্বিতীয় খণ্ডে লালা জমিদারদের নিয়ে লিখেন। কিছু নিরপেক্ষ তথ্য তুলে ধরা হল-
১। সেই সময় রাইসবর নিবাসী তালুকদার রামচন্দ্র গুহ-মুস্তফি অবস’াপন্ন লোক ছিলেন। তিনি তার খোঁড়া কন্যাকে কৌশলে কংস নারায়নের সাথে বিবাহ দেন। কংস নারায়ন যৌতুক সরূপ রাইসবর গ্রামের কতক সম্পত্তি প্রাপ্ত হন।
২। সংসারের ব্যয় বৃদ্ধি হইয়া যাওয়ায় নবার সরকারের খাজানা না দিতে পারায় ভূসম্পত্তিও নষ্ট হইতে চলিল। সংসারের নানা প্রকার অশান্তির দরুণ কংসনারায়ণের মস্তিষ্কবিকৃতি জন্মে।
৩। পিতার অবস’া দেখিয়া কীর্ত্তিনারায়ণ জাহাঙ্গীর নগর যাওয়ার পথে রায়পুরা গ্রামে আনন্দময়ীর মন্দিরে ঢাকার মহারাজ রাজবল্লভ এর সাক্ষাৎ পান এবং নমস্কার করে সংসারের সমস্ত বিষয় আনুপূর্ব্বিক তাকে জ্ঞাপন করিলেন। মহারাজ তাকে মহাফেজখানা সেরেস্তার মোহরার পদে নিযুক্ত করিলেন।
৪। শ্রী শব্দের অর্থ লক্ষ্মী, নগর শব্দের অর্থ উচ্চ প্রাসাদ সম্বলিত জনপদ। বিক্রমপুরে প্রভূত প্রভুত্বলাভ করিয়া লালা কীর্ত্তিনারায়ণ মনোরম বাসভবন সমন্বিত রাইসবর গ্রামের নাম সমৃদ্ধশালী নগর অর্থে শ্রীনগর রাখেন।
৫। লালা বংশ ধর্মীয় কাজে বিপুল ব্যয় করলেও প্রজাসাধারণের জন্য শিক্ষা, যাতায়াত ও স্বাস’্যসেবার জন্য তেমন কিছু করেন নি।
৬। লালা বংশের আর কেউ বর্তমানে শ্রীনগরে বসবাস করেন না।

বি.দ্র: লালা বংশ নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছেন কবি ফাহিম ফিরোজ। তিনি জানালেন লালা কৃত্তিনারায়ন বসু নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে প্রথমে একটি বিয়ে অথবা পরকিয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। তার ঔরসে সেখানে জন্ম হয় এক কন্যার। তার নাম মোহন বালা। সেখানকার স্ত্রী /প্রেমিকা এক নাপিতের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে লালা তার স্ত্রী /প্রেমিকা এবং নাপিতকে হত্যা করেন। এতে প্রজারা ক্ষিপ্ত হলে তিনি শ্রীনগরে ফিরে আসেন। তিনি আরো জানান, লালা শ্রীনগরেও আরো নারী ঘটিত কেলেংকারীতে জড়িয়ে পড়েন। এক সুন্দরী নারী তাকে মদের সাথে বিষ মিশিয়ে দিলে তিনি মারাত্মক অসুস’ হয়ে পড়েন এবং কিছু দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। লালা শ্রীনগরেও প্রজাদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। তিনি দামলায় অনেক প্রজাকে হত্যা করেন।
এই লেখাটি ইতিপূর্বে হিমাংশুমোহন চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও, শ্রীনগর সরকারি কলেজ বার্ষিকী, বিক্রমপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের মুখপত্র ঢেউ-এ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *